তামিম দেখালেন ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট’

তামিম দেখালেন ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট’
তামিম দেখালেন ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট’

‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, বাট ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট’ (ফর্ম সাময়িক, কিন্তু মান চিরস্থায়ী)- ক্রিকেট অভিধানের বহুল প্রচলিত ‘প্রবচন।’ শুধু প্রবচন বলা সম্ভবত ঠিক হবে না। বাস্তবেও তার দেখা মেলে প্রায়ই।

অনেক বড়, নামি-দামি তারকাও মাঝে মধ্যেই ফর্ম হারিয়ে ফেলেন। তাদেরও খারাপ সময় যায়। কখনো কখনো ব্যাটসম্যানদের রান খরা যায়। বিশ্ব মানের উইলোবাজের ব্যাটও হাসে না। দেখে মনে হয় রান করা ভুলে গেছেন। আবার অনেক বড়মাপের বোলারেরও বলের ধার কমে যায়। উইকেট পেতে কাঠখড় পোড়াতে হয়।

তারও কত নাম-অফফর্ম, ব্যাড প্যাচ, খারাপ সময়। তামিম ইকবালেরও হয়তো তাই গেছে। মাঝে ইনজুুরি এসে গ্রাস করেছিল। একটু আধটু ফিটনেস সমস্যাও ভুগিয়েছে। সব মিলে ব্যাট সেভাবে কথা বলেনি। তামিমকে তার মতো করে দেখা যায়নি। বিপিএলে প্রায় ৪০০ (৩৯৬) রান করলেও স্ট্রাইকরেট ছিল মাত্র ১০৭-১০৮’এর আশপাশে।

আর পাকিস্তানের বিপক্ষে দুই টি-টোয়েন্টি ম্যাচে দলের সর্বোচ্চ স্কোরার (দুই খেলায় ১০৪) হলেও আবারও সেই স্ট্রাইকরেট ছিল বেশ কম। তাই তামিমের ভালো খেলা এবং এক ম্যাচে ৩৯ আর পরের ম্যাচে ৬৫ রানের ইনিংস দুুটো ঢাকা পড়ে গেছে। তা নিয়ে কথাও হয়নি তেমন।

বরং আক্রমণাত্মক মেজাজের অভাব ছিল ব্যাটিংয়ে। তেমন তেজ ছিল না, চটকদার মারের ঘাটতি ও স্ট্রাইকরেট কম ছিল-এসব কথাই হয়েছে বেশি। সে সব তীর্যক কথাবার্তা নিশ্চয়ই তার কানেও গেছে।

তামিমও হয়ত তেঁতে ছিলেন-যেভাবেই হোক আমি সুযোগ পেলে সেই সমালোচকদের জবাব দেব। দেখিয়ে দেব ক্রিকেটের সবচেয়ে ছোট ফরম্যাটে আগের সেই উত্তাল উইলোবাজি করতে না পারলেও দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে তামিম এখনো দেশসেরা।


তার ব্যাটের ধার যে চার ও পাঁচ দিনের ম্যাচে একটুও কমেনি। লম্বা সময় উইকেটে থাকার পাশাপাশি দীর্ঘ ইনিংস খেলার সামর্থ্যটাও যে ঠিক আগের মতই আছে, আজ ২ ফেব্রুয়ারি রোববার শেরে বাংলায় সেই সত্যের দেখাই মিললো।

বলার অপেক্ষা রাখে না, তামিম বরাবরই টেস্টে ভালো খেলেন। এই ফরমেটে দেশের সর্বাধিক স্কোরারও তিনি। গত বছর এই ফেব্রুয়ারিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুই টেস্টে এক সেঞ্চুরি (১২৬) আর দুটি বিগ ফিফটি (৭৪, ৭৪) আছে তার। তারপর অবশ্য আর টেস্ট খেলা হয়নি। তবে এবার বিসিএলে প্রথম ম্যাচেই বিদ্যুৎ খেললো তামিমের ব্যাটে। ইসলামি ব্যাংক পূর্বাঞ্চলের হয়ে ওয়ালটন মধ্যাঞ্চলের বিপক্ষে বিসিএলে এদিন তামিম ইকবাল রান খরা কাটিয়ে একদম ট্রিপল সেঞ্চুুরি হাঁকিয়ে বসলেন।

ইতিহাস জানাচ্ছে , টেস্টে একটি ডাবল সেঞ্চুরি (২০১৫ সালে খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০৬) থাকলেও বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে আগে কখনো দু‘শো রান করা হয়নি তামিমের। ঐ একমাত্র ডাবল সেঞ্চুরিই এতকাল তার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেরও একমাত্র ডাবল হান্ড্রেড (টেস্টও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের অন্তর্ভুক্ত)।

এখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে রকিবুল হাসানের পর দ্বিতীয় ট্রিপল সেঞ্চুরিয়ান হবার পাশাপাশি ফার্স্টক্লাস ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসটির (৩৩৪ নট আউট) মালিকও এখন তামিম ইকবাল।

টেস্ট (৪৩২৭), ওয়ানডে (৬৮৯২) আর টি-টোয়েন্টি (১৬৬০)- তে দেশের সবচেয়ে বেশি রানের মালিক তিনি। টেস্টে মুশফিকুর রহীম (২১৯) আর সাকিব আল হাসানের (২১৭) পর তৃতীয় সর্বোচ্চ (২০৬) রানের ইনিংসটিও তার ব্যাট থেকেই এসেছে। আর ওয়ানডে ক্রিকেটে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ ১৫৪ রানের ইনিংস তামিমের। দেশের হয়ে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে একমাত্র শতরানটিও তার।

সেই ব্যাটসম্যান সাময়িকভাবে একটু রান না পেলেও সন্দেহাতীতভাবে দেশের অন্যতম সেরা উইলোবাজ। ঘরোয়া ক্রিকেটে তার ব্যাট থেকে ট্রিপল সেঞ্চুরি আসবে, তিনিই সবচেয়ে বড় ইনিংসটির সৃষ্টা হবেন-সেটাই তো স্বাভাবিক।

তামিমের মেধা-প্রজ্ঞা আর মানের ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে সেটাই কাম্য। কারণ ঐ যে ওপরে বলা হয়েছে, ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট।’ তামিমের ফর্ম মাঝে যেমনই যাক না কেন, তার ‘ক্লাস’ যে অনেক ওপরে, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খান পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্য সেটি দেখিয়ে দিলেন মাঠেই। ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি শেরে বাংলায় গড়া মহাকাব্যিক ইনিংসটি উঠেও গেল ইতিহাসের পাতায়।